টেকনাফের হোয়াইক্যং বাজার থেকে বাহারছড়ায় মাছ কেনার জন্য অটোরিকশায় রওনা দেন চারজন রোহিঙ্গা। বাজারে যাওয়ার আগেই হোয়াইক্যং-শামলাপুর সড়কের মাঝপথে অটোরিকশা আটকে চালকসহ অটোর এই চার যাত্রীকে আটক করে পাহাড়ে নিয়ে যায় অপহরণকারীরা। ওই সড়কে অপহরণের ঘটনাটি ঘটে গত ৩ জুন। দুই দিন পর যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে। পাঁচজনের মধ্যে। মধ্যে অপহৃত অটোচালক টেকনাফের হোয়াইক্যংয়ের দৈংগ্যাকাটার নূর আহমেদের ছেলে মো. শামসু আলমও ছিলেন। ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে অটোরিকশাটি উদ্ধার করে। তারও আগে গত ২২ মে একই সড়কে ট্রাকচালকসহ পাঁচজনকে অপহরণ করেছিল দুর্বৃত্তরা। পরে এই অপহৃতরা কৌশলে বাড়ি ফেরেন। এভাবেই টেকনাফে অপহরণের ঘটনা ঘটছে। ক্ষেতমজুর, শ্রমিক, বনকর্মী, ছোট ছোট বাহনের চালক, ছাত্র-ছাত্রী, ব্যবসায়ী, পর্যটক ও রোহিঙ্গারা অপহরণের শিকার হচ্ছেন। কক্সবাজার জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত মে মাস পর্যন্ত সাড়ে ১৭ মাসে টেকনাফের বিভিন্ন স্থানে অপহরণের শিকার হন কমপক্ষে ২৫৪ জন। স্থানীয়রা বলছে, অপহরণের কিছু ঘটনার রেকর্ড পুলিশের কাছেও নেই। অপহরণের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।
মেরিন ড্রাইভ, নাফ নদ ও সবুজ পাহাড়ের সৌন্দর্যে ঘেরা টেকনাফ উপজেলায় অপহরণ ও মুক্তিপণ বাণিজ্য বাড়ছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, উপজেলায় বেশি অপহরণের ঘটনা ঘটছে উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন হ্নীলা, হোয়াইক্যং ও বাহারছড়ায়। সবচেয়ে বেশি ঘটছে বাহারছড়ার নোয়াখালীপাড়া, বড় ডেইল, মাথাভাঙা, জাহাজপুড়া, ভাগগুনা, মারিশবনিয়া, হোয়াইক্যংয়ের ঢালা, চৌকিদারপাড়া ও দক্ষিণ শীলখালীতে। ভুক্তভোগীরা জানান, অপহরণের পর তাঁদের বেশির ভাগই মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পেয়েছেন। স্থানীয় সূত্র জানায়, অপহরণ বাণিজ্যে কমপক্ষে ১২টি চক্রের শতাধিক ব্যক্তি জড়িত।
রোহিঙ্গা ও স্থানীয় কিছু ডাকাতও এই অপহরণ বাণিজ্যে রয়েছে। ডাকাতদের কাছে আছে ভারী অস্ত্র। এদের সঙ্গে মানবপাচারকারীচক্রের যোগসূত্রও রয়েছে। মুক্তিপণ দিতে ব্যর্থ হলে অনেককে মানবপাচারকারীদের কাছে অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। অপহৃতদের পাচারের পরও ভুক্তভোগীর পরিবারের থেকে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। রোহিঙ্গা অধ্যুষিত হওয়ায় উপজেলার হীলা ও বাহারছাড়া ইউনিয়নে অপহরণের ঘটনা বেড়েছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, টেকনাফ সীমান্তের পাহাড়গুলোই অপহরণকারীদের ডেরায় পরিণত হয়েছে। অপহরণকারীদের বেশির ভাগ রোহিঙ্গা ক্যাম্পের। তারা স্থানীয়দের যোগসাজশে
অপহরণের বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অপহৃতরা নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে শেষতক মুক্তিপণের টাকা দিয়ে ঘরে ফেরেন। সীমান্তের পাহাড়ে র্যাব-পুলিশ অভিযান চালিয়েও অপহৃতদের উদ্ধার করছে। পরিস্থিতির বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে কক্সবাজারের র্যাব-১৫-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুল ইসলাম গত বৃহস্পতিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অহরণকারীরা নানা কৌশলে অপহরণ বাণিজ্য চালাচ্ছে। এমনকি র্যাব পরিচয়েও অপহরণের ঘটনা ঘটাচ্ছে। তাদের অনেকে হাতেনাতে ধরাও পড়েছে। গত ১১ জুন রাতে অপহরণকারীরা কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প-১৫ এলাকা থেকে র্যাব পরিচয়ে রোহিঙ্গা যুবক হাফিজ উল্ল্যাহকে অপহরণ করে। অপহরণের পর তারা অপহৃতের পরিবারের কাছে ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। অপহরণের তিন দিন পর র্যাব টেকনাফের গহিন অরণ্য থেকে অপহৃতকে উদ্ধার করেছে। অপহরণের ঘটনায় জড়িত মূল হোতা মো. সুমন মুন্সিকে অস্ত্র, গুলি, ইউনিফর্ম, ওয়াকিটকিসহ আটক করা হয়। সুমনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ১১টি মামলা রয়েছে। তার মতো অনেকেই অপহরণের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।’ র্যাব ও পুলিশ সূত্র জানায়, অপরাধীদের বেশির ভাগ একবার ধরা পড়ার পর সহজেই বেরিয়ে আবার একই অপরাধে জড়াচ্ছে। পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, গত বছরের ৩০ ও ৩১ ডিসেম্বর দুই দিনে টেকনাফে ২৭ জন অপহরণের শিকার হন।
টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের জাদিমুড়ায় বনে কাজ করতে যাওয়া রোহিঙ্গাসহ ১৯ জন শ্রমিকও অপহরণের শিকার হন। তাঁদের পরিবারের কাছে ফোন করে অপহরণকারীরা জনপ্রতি এক লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছিল। তবে পরে অপহৃতদের উদ্ধার করেছিল র্যাব ও পুলিশ। গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর হ্নীলা বাজারের ব্যবসায়ী নাটমুড়াপাড়ার মোহাম্মদ আতিক (২৬) অপহরণের শিকার হয়েছিলেন।
অপহৃত মোহাম্মদ আতিক পরে উদ্ধার পান। তিনি কয়েক দিন আগে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওই দিন রাত ৯টায় সাত অস্ত্রধারী আমাকে অপহরণ করে মুচনি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশের পাহাড়ে নিয়ে যায়। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় দুই স্থানীয়সহ আরো পাঁচ ব্যক্তি। অপহরণকারীরা ৫০ লাখ টাকার মুক্তিপণ দাবি করেছিল। শেষমেশ নগদ ১২ লাখ টাকা দিয়ে মুক্তি পাই।’ ১২ জন অপহরণকারীর মধ্যে তিনি স্থানীয় দুজনসহ সাতজন রোহিঙ্গার পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে টেকনাফ থানায় মামলা করেছিলেন। পরে একজন ধরা পড়ে কিছুদিনের মধ্যে ফিরে এসে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। অন্য অপরাধীরা এখনো ধরা পড়েনি। আতিক জানান, মূলত রোহিঙ্গারাই অপহরণকারী হিসেবে কাজ করে। তাদের সহযোগী থাকে স্থানীয়রা। তারা এমনই বেপরোয়া যে ফেরিওয়ালারা থেকে সাধারণ ব্যবসায়ী-যখন যাকে পাওয়া যায়, তাকেই সুযোগে পেয়ে অপহরণ করে।
গত ৮ জানুয়ারি অপহরণকারীর ডেরা থেকে মুক্তি পেয়ে ফেরেন বাহারছড়া ইউনিয়নের বড় ডেইল এলাকার ব্যবসায়ী জসিম উদ্দীন। ৯ দিন নির্যাতনের পর তাঁকে মুক্তি পেতে গুনতে হয়েছে ১৫ লাখ টাকা। ব্যবসায়ী জসিম জানিয়েছেন, অপহরণকারীরা ৯ দিনে মারতে মারতে পুরো শরীর থেঁতলে দিয়েছিল। পরে জসিমের পরিবার অপহরণকারীদের হাতে মুক্তিপণের টাকা পৌছে দিলে জসিম মুক্তি পান। গত ৩ ফেব্রুয়ারি বাহারছড়া ইউনিয়নের বাইন্যাপাড়া পাহাড় থেকে কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনজন কাঠুরিয়া অপহরণের শিকার হন। পরে পুলিশের অভিযানে তাঁদের ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে যায় অপহরণকারীরা। গত ১০ মার্চ যৌথ বাহিনীর অভিযানে টেকনাফের হ্নীলা আলীখালী পাহাড় থেকে উদ্ধার করা হয় ১১ অপহৃতকে। ওই অপহরণকারীদের কেউ আটক হননি।
টেকনাফ সরকারি কলেজের অধ্যাপক ও উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম বলেন, বিশাল পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসীরা আস্তানা গড়ে তুলেছে। তারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রতিনিয়ত অপহরণ ও
সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। পাহাড়ে অবস্থানরত এই সন্ত্রাসীদের ধরতে পুলিশ ও র্যাব একাধিক অভিযান পরিচালনা করেছে। কিন্তু এখনো তাদের দমন করা যায়নি। এখন প্রযুক্তির যুগ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী চেষ্টা করলে তথ্য-প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করেও অপহরণের ঘটনা রোধ করতে পারে।
টেকনাফ মডেল থানার ওসি (তদন্ত) হিমেল রায় বলেন, অপহরণকারীরা মুক্তিপণের টাকা আদায় করত অনলাইন লেনদেনে। পুলিশ সেই সূত্র ধরে বেশ কয়েকজনকে আটক করার পর তাদের মুক্তিপণ আদায়ের অনলাইন লেনদেন বন্ধ হয়ে যায়।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘সীমান্ত এলাকায় অপহরণ বাণিজ্য বন্ধে আমরা তৎপর রয়েছি। অপহরণের ঘটনার খবর পেলেই পুলিশ উদ্ধার অভিযানে নেমে পড়ে। সমস্যা হচ্ছে, দুর্গম পাহাড়েই রয়েছে অপহরণকারীদের ডেরা। এসব সন্ধান করে বের করার আগেই সটকে পড়ে অপহরণকারীরা।’ তিনি জানান, এরই মধ্যে গহিন অরণ্যে পুলিশ-র্যাবের যৌথ বাহিনীর দল ড্রোন নিয়েও কয়েকবার অভিযান চালিয়েছে। পাহাড়ের বহু আস্তানাও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অপহরণকারীরা অভিযানের পর ফের একই অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে।
সূর্যোদয় :- ৫:১০ | সূর্যাস্ত :- ৬:৪৯ |
নাম | সময় |
ফজর | ৪:১৫ |
যোহর | ১২:১০ |
আছর | ৪:৫০ |
মাগরিব | ৬:৪৫ |
এশা | ৮:১৫ |