বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত সমুদ্র, পাহাড়, নদী, কৃষিভূমি ও চারণভূমির সমন্বয়ে সৃষ্ট প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি সীমান্ত নগরী টেকনাফ। আর টেকনাফের অন্যতম আন্তর্জাতিক ট্যুরিস্ট স্পট ‘প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন’ বা ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’।
আমার এখনো মনে পড়ে ২০১০ সালে সেন্টমার্টিন ভ্রমণের কথা। সেসময় দ্বীপের মনোরম বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্য স্বচক্ষে অবলোকন করেছিলাম। দেখেছিলাম সেখানকার মানুষের জীবনধারণ ও জীবিকার বৈচিত্র্যতাও।
কেয়া বনে ঘেরা দ্বীপটিতে মানুষের প্রধান জীবিকা ছিলো সমুদ্রে জাল ফেলা আর কৃষিকাজ করা। ওই সময় সামুদ্রিক মাছ দ্বীপবাসীর চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশের বাইরেও রপ্তানি করা হতো।
নারিকেল জিঞ্জিরা থেকে একটু দূরে সমুদ্রের মাঝে আরেকটি দ্বীপ রয়েছে।যেটি সকলের কাছে ‘ছেঁড়াদ্বীপ’ নামে পরিচিত।
২০১৩ সালে ছেঁড়াদ্বীপ ভ্রমণে বের হলাম আমরা। সমুদ্রে ভাটা থাকলে নাকি হেঁটেই পার হওয়া যায়। তবে আমরা যাওয়ার সময় জোয়ার চলে এসেছিলো। সংখ্যায় বেশি হওয়ায় বড় একটা মেশিন বোট নিলাম। স্থানীয় ভাষায় এগুলোকে ‘ঘাম বোট’ বলা হয়। দ্বীপের কাছাকাছি যেতেই মাঝি বললো- “এখন ডিঙিতে যেতে হবে”… ডিঙি নৌকায় উঠেই আমরা বিস্মিত হলাম! স্রষ্টার সৃষ্টি যে এতো সুন্দর তা স্বচক্ষে না দেখলে হয়তো উপলব্ধি করা যেতো না। বোট থেকে সমুদ্রের তলদেশ দেখা যাচ্ছিলো। ছোট-বড় শৈবালসহ হরেকরকম সমুদ্রতলের জীব। আহা! কী মনোমুগ্ধকর রূপ! ছোট-বড় অনেক মাছ স্বচ্ছ পানিতে খেলা করছিলো।
দ্বীপে পৌঁছে আমরা আরও বেশি বিস্মিত হলাম। পাথরও যে এত সুন্দর হতে পারে, ছেঁড়াদ্বীপ না গেলে হয়তো জানতামই না। আমরা যখন ছেঁড়াদ্বীপ পৌঁছালাম তখন সূর্য ঠিক মাথার উপর। গলা শুকিয়ে কাঠ।খাওয়ার মতো ছিলো একটিমাত্র ডাবের দোকান। ডাবের পানি পান করতে করতে চোখ পড়লো কেয়া বনের দিকে। কয়েকটি গুইসাপ কেয়া বনের ঝোপ থেকে উঁকি দিচ্ছে। শিশুসুলভ স্বভাবের কারণেই গুইসাপগুলোকে দিলাম এক দৌড়ানি।এরই মাঝে আম্মু ডেকে সাবধান করে দিয়ে বললো- “গুইসাপ লেজের বারি দিবে।” আমাদের জানা ছিলো গুইসাপের লেজ দেহের যে অংশে লাগে, সে অংশটি পঁচে যায়।
ছেঁড়া দ্বীপ থেকে দুপুরবেলা সেন্টমার্টিন ফিরেই খাবার খেতে গেলাম এক আত্মীয়ের বাসায়। খাওয়া-দাওয়া শেষে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। সূর্য নামতেই আমরা আবার ঘুরতে বেরিয়ে পড়লাম।সেন্টমার্টিন দ্বীপটি সত্যিই অসাধারণ! ফসলি জমিতে সবজি পরিপূর্ণ। অনেক ফলমূলের গাছও রয়েছে। এককথায় ‘পরিপূর্ণ একটি কৃষি গ্রাম’। ওইখান থেকে আবার সমুদ্রের দিকে গিয়ে দেখি জেলেরা জাল তুলছে। জাল ভর্তি মাছ। নৌকাগুলো সারিবদ্ধভাবে তীরে ভিড়েছে। এসব দেখে আর হোটেলে ফিরতেই ইচ্ছে করছিলো না। স্থানীয়দের বাড়িঘরে দেখলাম শুটকির মাঁচান আর পিঁয়াজ লটকানো।এরই মধ্যে আম্মু বাড়ির জন্য দুই জোড়া রেঙ্গুনি পিঁয়াজও নিয়ে নিলো।
পথ হারিয়ে স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করতে করতে কোনরকম হোটেলে পৌঁছাই আমরা। দ্বীপে এতোবেশি কেয়া বন ছিল বলার মতো না। যার কারণে আমরা পথ হারিয়ে ফেলি। আর হোটেল ছিল মুষ্টিমেয়। কেয়া বনগুলো ছিল প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ।
সময়ের বিবর্তনে ট্যুরিস্ট বেড়ে যাওয়ার কারণে দ্বীপবাসী ট্যুরিজম ব্যবসাকে আঁকড়ে ধরতে কৃষি, মাছ ধরাসহ অন্যান্য সকল ধরণের জীবিকা ছেড়ে দিলো।
স্থানীয়রা নিজস্ব জায়গা-জমি বিভিন্ন নামকরা কোম্পানির নিকট বিক্রি করে দিলো। সাথে কৃষিজমিও। কোম্পানিগুলো বীচভিউ হোটেল-রেস্টুরেন্ট করতে প্রতিযোগিতায় নামল। আর এই প্রতিযোগিতার যাঁতাকলে পড়ে হারিয়ে গেলো দ্বীপের একমাত্র রক্ষাকবচ খ্যাত ‘কেয়া বন’। পাশাপাশি হারিয়ে গেলো কেয়া বনে বাস করা নানা জীবজন্তু। ধ্বংস হলো দ্বীপের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য।
বিগত দুই মৌসুম পর্যটক শিথিল থাকায় দ্বীপবাসীর উপর নেমে এলো এক নিরব অভিশাপ। যেটিকে আমরা দ্বীপের চরম দুর্ভিক্ষও বলতে পারি। সেখানকার মানুষের খাবারের অভাব। কুকুরসহ দ্বীপের জীবজন্তু না খেয়ে মারা যাচ্ছে। চিরচেনা জীবিকা কৃষিকাজেও আর ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। কারণ পর্যাপ্ত কৃষি জমিও আর নেই। মাছ ধরার জন্য সমুদ্রে যাওয়া যাচ্ছে না নিষেধাজ্ঞার কারণে।
স্বাস্থ্যসেবাও খুবই নাজেহাল অবস্থা। ২০ শয্যার একটি হাসপাতাল সেটআপ আছে কিন্তু কোন ডাক্তার বা জনবল নাই। যার কারণে চিকিৎসার অভাবে মানুষ নেহায়েত অবস্থায় মারা যাচ্ছে।
সেন্টমার্টিন দ্বীপের মানুষসহ জীবজন্তুর জীবন বাঁচাতে আপনাদের সকলের এগিয়ে আসা উচিত। আপনারা কথা বলুন। প্রশ্ন করুন। আওয়াজ তুলুন।
এভাবেই শান্ত আকাশে ঘন বর্ষণ,
দংশন করে অজস্র ভবিষ্যৎ! সজীব উজ্জ্বল জীবনে নেমে আসা ঘন অন্ধকার বিপর্যস্ত প্রাণগুলোর আগামী কী?
লেখক: রবিউল হাসান মামুন
মানবিক সমাজকর্মী ও সংগঠক।
সূর্যোদয় :- ৫:১০ | সূর্যাস্ত :- ৬:৪৯ |
নাম | সময় |
ফজর | ৪:১৫ |
যোহর | ১২:১০ |
আছর | ৪:৫০ |
মাগরিব | ৬:৪৫ |
এশা | ৮:১৫ |