দেশের একমাত্র প্রবাল সমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্টমার্টিনে ১১ হাজার মানুষের বসবাস। এখানকার মানুষের একমাত্র আয়ের উৎস পর্যটন ব্যবসা। সেন্টমার্টিনে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গত ১ ফেব্রুয়ারী থেকে পর্যটক ভ্রমণ বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। এতে আয়ের প্রধান উৎস বন্ধ হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে দ্বীপটির ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের মধ্যে।
গত শনিবার সেন্টমার্টিন সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দ্বীপের শত শত পরিবার জীবিকার অনিশ্চয়তায় দিশেহারা। কাজকর্ম নেই। দরজা বন্ধ হোটেল, কটেজ ও রেস্টুরেন্টগুলোর। ট্যুর গাইডরাও বেকার।
মারমেইড রিসোর্ট’র স্বত্বাধিকারী মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘গত ২০২৪ সালে ১০ মাস কোন ব্যবসা হয়নি। ডিসেম্বর এবং জানুয়ারি দুই মাসের মধ্যে শুধু ৪০ দিন ব্যবসা হয়েছে। তার হোটেলে ১৭ জন কর্মচারী ছিল। সবাইকে বিদায় করে একজন কেয়ারটেকার দেখাশোনা করছে।
মাহবুব আক্ষেপ করে বলেন, ‘জীববৈচিত্র্য রক্ষার নামে দ্বীপবাসীর ওপর জুলুম করা হচ্ছে। দ্বীপের মানুষ বেশি কষ্টে আছে। আর কয়দিন পর এই অবস্থাও থাকবে না। মানুষ না খেয়ে মরবে। সবদিক বিবেচনা করে সীমিত আকারেও যদি কিছু পর্যটক আসার সুযোগ করে দেওয়া হয়, তাহলে মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসবে।’
ইউরো বাংলার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আজিজুল হক বলেন, ‘২০২৪ সালে তো কোন ব্যবসা হয়নি। দুই মাস সময় পেয়েছিলাম। এই ব্যবসায় তো আর বছর চলে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে দুর্ভিক্ষ নেমে আসবে।’
শনিবার সকালের দিকে দ্বীপের পশ্চিমে সমুদ্র পাড় দিয়ে হাঁটছিলেন স্থানীয় পঞ্চাশোর্ধ জেলে আবুল কালাম। কাঁধে একটি দা।
কেমন আছেন জানতে চাইলে উত্তরে বললেন, ‘ভালো নেই। গরিবের তো কর্ম করে খেতে হয়। কাজ নেই ভালো থাকবো কিভাবে ? স্ত্রীসহ ৫ সন্তানের সংসার। ধার করে আর কয়দিন চলতে পারবো? আপনি সাংবাদিক, একটু সরকারকে বলেন না! আমরা না খেয়ে মরে যাচ্ছি। এই দ্বীপের মানুষের কান্না কি সরকারের কাছে যায়না?’
তার সাথে হাঁটতে হাঁটতে দেখা হয় জমির উদ্দিনের সাথে। তিনিও পেশায় একজন জেলে। আলাপকালে বলেন, ‘ঘরে মা অসুস্থ। দু’টি সন্তানের মধ্যে মেয়ের কয়েকদিন ধরে জ্বর। টাকার অভাবে ডাক্তার দেখাতে পারছি না।’
তিনি জানান, সাগরে মাছ ধরে চলে সংসার। কিন্তু মাছ ধরা বন্ধ থাকায় সংসার নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
৪ নং ওয়ার্ডের মাঝের পাড়া মদিনা বেগমের সংসারে ৫ সন্তান। স্বামী ইউনিয়ন পরিষদে দফাদার হিসেবে চাকরি করতেন। কয়েকমাস আগে তার চাকুরীটা চলে যায়।
কাজকর্ম না থাকায় অমানবিক দিন কাটছে মদিনা বেগমের পরিবারের।
একই এলাকার ফাতেমা খাতুন। বয়স ৬০ বছর। অনেক আগেই মারা গেছে স্বামী। ফাতেমা খাতুন বলেন, এই দ্বীপে এমন সময় তিনি গত ৩০ বছরেও দেখেননি।
মুদির দোকানের ব্যবসায়ী ঈমাম শরীফ বলেন, ‘টেকনাফ থেকে মালামাল আনতে তিন জায়গায় হাসিল দিতে হয়। একটি ৫০ কেজি চালের বস্তায় বাড়তি ১৫০ টাকা খরচ পড়ে। অভাবের কারনে মানুষ বাকি চেয়ে বসে থাকে। না দিয়েও পারিনা। আবার দিলেও সেই টাকা সময় মতো দেয়না।
তিনি বলেন, ‘পর্যটক আসলে মোটামুটি ভালো একটা ব্যবসা হয়। কিন্তু গত তিনমাস থেকে ব্যবসা মোটেও নেই।’
সেন্টমার্টিন বাজারে ডাব বিক্রি করছেন এক বৃদ্ধ। দুই ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকেও তিনি একটি ডাবও বিক্রি করতে পারেননি। জানতে চাইলে তিনি বলেন, মানুষ নিজে চলতে পারছে না, সেখাবে ডাব কিভাবে খাবে। পর্যটকরা আসলে এক ধাক্কায় সব নিয়ে যায়।
স্থানীয়দের মতে, অভাবের কারণে দ্বীপের শিশুরা স্কুলে যেতে পারছে না। ইতিমধ্যে বন্ধ হয়েছে কয়েকশো শিশুর লেখাপড়া। দ্বীপে কোনো বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা নেই। কোনো সরকারি সাহায্যও তারা পায়নি। এ অবস্থা চলতে থাকলে দুর্ভিক্ষ নেমে আসবে সেন্টমার্টিনে।
নিজের পরিচয় গোপন রেখে এক ব্যক্তি বলেন, টাকার অভাবে কলেজ পড়ুয়া ছেলের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে। মানসম্মানের দিকে চেয়ে যেকোনো কাজও করতে পারছি না। অভাবের কথা কাউকেও বলতেও পারছিনা। ইচ্ছে হয় বিষ খেয়ে নিজেকে শেষ করে ফেলি। এ জীবন আর ভালো লাগে না।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদ ২ নং ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার হাবিবুর রহমান বলেন, ‘এই দ্বীপে কয়েকশো হোটেল ছিল। যেখানে ২ হাজারের অধিক কর্মচারী কাজ করতো। এখন সবাই বেকার হয়ে গেছে। অনেকে গৃহপালিত পশু বিক্রি করে সংসারের খরচ চালাচ্ছে। সোনা-গয়না যা ছিল তাও বিক্রি করে দিয়েছে অনেকে।
তিনি বলেন, ‘এ অবস্থা আগে কখনো দেখিনি। পর্যটক সাথে সাথে সাগরে মাছ ধরাও বন্ধ। মানুষ চলবে কিভাবে সেই চিন্তা কারোই নেই।’
জেলা প্রশাসক মো সালাহউদ্দিন বলেন, ‘দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দাদের বিকল্প আয়ের বিষয়টি সরকারের নজরে আছে। প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার দায়িত্ব সবার। এতে করে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাঁদের সরকারি সহায়তা প্রদান করা হবে।’
সূর্যোদয় :- ৫:১০ | সূর্যাস্ত :- ৬:৪৯ |
নাম | সময় |
ফজর | ৪:১৫ |
যোহর | ১২:১০ |
আছর | ৪:৫০ |
মাগরিব | ৬:৪৫ |
এশা | ৮:১৫ |